বান্দরবানে ভয়াবহ দুর্যোগ: পাহাড়ি ঢলে শিশুর মৃত্যু, নাফাখুমে আটকা ৮৭ পর্যটক; ১০ জুলাই পর্যন্ত বন্ধ সব পর্যটনকেন্দ্র
নিজস্ব প্রতিবেদক | Time tv24.info
৭ জুলাই ২০২৬
📌 এক নজরে
- পাহাড়ি ঢলের স্রোতে ৫ বছরের এক শিশুর মৃত্যু
- নাফাখুম জলপ্রপাতে ৭৮ পর্যটক ও ৯ গাইডসহ মোট ৮৭ জন আটকা
- আগামী ১০ জুলাই পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা সব পর্যটন কেন্দ্র
- বিভিন্ন উপজেলায় বন্যা, পাহাড়ধসের আশঙ্কা ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন
- ১৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন ছিল বান্দরবানের চার উপজেলা
- জেলায় ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করেছে প্রশাসন
টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে কার্যত দুর্যোগ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে পার্বত্য জেলা বান্দরবানে। বন্যা, পাহাড়ধসের আশঙ্কা, সড়ক যোগাযোগে বিঘ্ন এবং দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় জেলার জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এদিকে প্রবল স্রোতে ভেসে এক শিশুর মৃত্যুর পাশাপাশি দুর্গম নাফাখুম জলপ্রপাতে ৭৮ জন পর্যটক ও ৯ জন গাইডসহ মোট ৮৭ জন আটকা পড়েছেন।
পরিস্থিতি বিবেচনায় আগামী ১০ জুলাই পর্যন্ত জেলার সব পর্যটন কেন্দ্র, ঝর্ণা, পাহাড়ি ট্রেইল, নদীপথ ও দুর্গম এলাকায় ভ্রমণ সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে জেলা প্রশাসন।
নাফাখুমে আটকা ৮৭ পর্যটক
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অব্যাহত ভারী বর্ষণে থানচি উপজেলার সাঙ্গু নদীর পানি বিপজ্জনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় উপজেলা সদর থেকে তিন্দু ও রেমাক্রী ইউনিয়নের নৌযোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফলে নাফাখুম জলপ্রপাত এলাকায় অবস্থানরত ৭৮ জন পর্যটক ও ৯ জন গাইড সেখানে আটকা পড়েন।
পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রশাসন জেলার সব পর্যটন স্পট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
পাহাড়ি ঢলে শিশুর মৃত্যু
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে সীমান্তবর্তী নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায়। সেখানে পাহাড়ি ঢলের প্রবল স্রোতে ভেসে গিয়ে আলিয়া সোলতানা নামে পাঁচ বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
প্লাবিত লামা ও আলীকদম
এদিকে লামা ও আলীকদম উপজেলায় পাহাড়ি ঢল এবং মাতামুহুরী নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। আলীকদমের প্রধান সড়কের বিভিন্ন অংশ পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।
এছাড়া ফাইতং ইউনিয়নে পাহাড়ধসের ঘটনায় একটি বসতবাড়ির অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও এ ঘটনায় হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
জলাবদ্ধতায় পানিবন্দী বহু পরিবার
অতিবৃষ্টির কারণে বান্দরবান সদর উপজেলার কালাঘাটা, বালাঘাটা, বনরূপা পাড়া, সিদ্দিক নগরসহ বিভিন্ন এলাকায় তীব্র জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। নিচু এলাকার বহু পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।
প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানি বিতরণ করছেন। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য মাইকিং করা হচ্ছে।
১৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন চার উপজেলা
ভারী বর্ষণে মাটি নরম হয়ে বান্দরবান-কেরানীহাট সড়কের গ্রীনপিক রিসোর্ট সংলগ্ন এলাকায় ৩৩ কেভি বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের একটি খুঁটি হেলে পড়ে। এতে বান্দরবান সদর, রোয়াংছড়ি, রুমা ও থানচি উপজেলায় প্রায় ১৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে হাসপাতাল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সেবাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। পরে জরুরি মেরামত কাজ শেষে বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরায় চালু করা হয়।
প্রশাসনের প্রস্তুতি
বান্দরবানের জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস জানিয়েছেন, সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলার সাতটি উপজেলায় ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পাহাড়ধস ও সড়কের ওপর মাটি-পাথর পড়ে যাওয়ার কারণে বিভিন্ন স্থানে যান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হলেও ফায়ার সার্ভিস, সিভিল ডিফেন্স এবং স্থানীয়দের সহযোগিতায় দ্রুত সড়ক সচল রাখতে কাজ চলছে।
তিনি পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে পাহাড়ি ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ভ্রমণ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।
জেলা প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী আগামী ১০ জুলাই পর্যন্ত বান্দরবানের সব পর্যটন কেন্দ্র, ঝর্ণা, পাহাড়ি ট্রেইল, নদীপথ ও দুর্গম এলাকায় ভ্রমণ থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

0 Comments