ডিসি অফিসের ঘুষের ফাঁদে প্রাণ হারালেন সাহাবুদ্দিন

নরসিংদীতে জমি অধিগ্রহণে ১ কোটি টাকা ঘুষ দাবি: সাহাবুদ্দিন গাজীর মর্মান্তিক মৃত্যু

নরসিংদীতে জমি অধিগ্রহণে ১ কোটি টাকা ঘুষ দাবি: সাহাবুদ্দিন গাজীর মর্মান্তিক মৃত্যু

সাহাবুদ্দিন গাজীকে তারা বাঁচতে দিলেন না। একরকম জোর করেই ১ কোটি টাকা ঘুস নিয়ে গেছে চক্রটি। জমি অধিগ্রহণের ৮ কোটি টাকার চেক পাশ করাতে তার কাছ থেকে ডাকাতি স্টাইলে এই টাকা নেওয়া হয়। কথাগুলো বলছিলেন হতভাগ্য সাহাবুদ্দিনের (৭৫) এক নিকটাত্মীয়। অধিগ্রহণের অর্ধেক টাকা উত্তোলনের সময় এভাবে ঘুস নেওয়া এবং হয়রানির বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি বয়োবৃদ্ধ সাহাবুদ্দিন। বয়সের কারণে তিনি আরও অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর ২৫ দিনের মাথায় ঘুমের মধ্যেই স্ট্রোক করে গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর মারা যান। চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটেছে নরসিংদী জেলায়। এখনো সমপরিমাণ ক্ষতিপূরণের টাকা বকেয়া থাকায় ভুক্তভোগী পরিবার ভয়ে মুখ খোলার সাহস পাচ্ছে না।

এদিকে এ ঘটনায় যুগান্তরের মাসব্যাপী অনুসন্ধানে ঘুস লেনদেনের অকাট্য তথ্যপ্রমাণ বেরিয়ে এসেছে। ডিসি অফিসের দালালরা ৬০ লাখ টাকার ঘুস নিয়েছে চেকের মাধ্যমে এবং ৪০ লাখ টাকা নেওয়া হয় নগদ। চেক ব্যাংকে জমা দিয়ে টাকা তুলে ভাগবাঁটোয়ারা করেছেন আমির হোসেন, যিনি ডিসি অফিসের এলএ শাখার দালালচক্রের অন্যতম ঘুস কালেক্টর। তার ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে ঘুসের টাকা তুলে নেওয়া হয়। আর এই টাকার ভাগ ডিসি, এডিসি (রাজস্ব), ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তাসহ ঘুস চেইনের প্রত্যেকে পজিশন অনুযায়ী ভাগ পেয়ে থাকেন। ঘুস লেনদেনের রাজসাক্ষী হিসাবে সার্ভেয়ার আমির হোসেন যুগান্তরের কাছে অকপটে সব স্বীকার করেছেন। কীভাবে ঘুস লেনদেন হয়, ডিসিসহ ঘাটে ঘাটে কারা কত টাকা কাদের মাধ্যমে নিয়েছেন-সব ফাঁস করে দিয়েছেন। এমনকি তিনি জানান, এমন চিত্র শুধু নরসিংদী নয় চলমান এই প্রকল্পের ৭ জেলার ডিসি অফিসে কমবেশি একই অবস্থা বিরাজ করছে।

এদিকে যে প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণ নিয়ে ঘুস লেনদেনের চাঞ্চল্যকর এ ঘটনা সামনে এসেছে, সেখানে আরও সাতটি জেলার সম্পৃক্ততা রয়েছে। সূত্রগুলো বলছে, ঘুস-কমিশনের দরকষাকষি চূড়ান্ত না হওয়ায় ভুক্তভোগী বেশির ভাগ মানুষ তাদের প্রাপ্য টাকা তুলে নিতে পারছেন না। চাহিদামাফিক কমিশন দিতে না চাইলে দালালচক্র দিয়ে উলটো ভুয়া মামলা করে এলএ কেসে আটকে দেওয়া হচ্ছে। আলোচ্য প্রকল্পে ঘুস লেনদেনের প্রমাণ দেন নরসিংদীর সাবেক এডিসি অন্জন দাশ এবং জমি অধিগ্রহণ শাখার সার্ভেয়ার আমির হোসেন। তারা দুজনই ডিসি, এডিসিসহ সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে প্রতিবেদককে মোটা অঙ্কের টাকার প্রস্তাব দিয়ে নিউজ থামাতে বলেন।

“সাহাবুদ্দিন গাজীকে তারা বাঁচতে দিলেন না — একরকম জোর করে ১ কোটি টাকা ঘুস নিয়ে গেছে চক্রটি।” — পরিবার ও ভুক্তভোগীরা।

ব্যাংক লেনদেন ও নথিপত্র

নথিপত্রে দেখা যায়, নরসিংদীর বাগহাটা মৌজায় শেভরন ফ্যাক্টরি অ্যান্ড মিলের ১৪ শতক জমির মধ্যে ৭ শতক ১৫/২০২১-২০২২ এলএ কেস নং-এর আওতায় অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়। এই জমির মালিক সাহাবুদ্দিন গাজী। অবশিষ্ট ৭ শতক জমির মালিকানা নিয়ে আপত্তি থাকায় এখনো এর সমাধান হয়নি। জমির মালিকানা সংক্রান্ত প্রমাণপত্রে ৬ জন কর্মকর্তার স্বাক্ষর দেখা যায়। গত বছরের ৪ এপ্রিল পর্যন্ত শেভরন ফ্যাক্টরির মালিকানায় ৭ শতক জমির দাম নির্ধারণ করা হয় ৮ কোটি ১৫ লাখ ৭৮ হাজার ৭০৬ টাকা। নরসিংদীর তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. মোস্তফা মনোয়ার, ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা চৌধুরী মুস্তাফিজুর রহমান, রেহানা মজুমদার মুক্তি, কানুনগো মো. আব্দুল জলিল, সার্ভেয়ার মুহা. আ. আজিজ ও সার্ভেয়ার আমির হোসেন জমির দাম নির্ধারণী নথিপত্রে স্বাক্ষর করেছেন।

ঘুষ লেনদেনের স্বীকারোক্তি

জমি অধিগ্রহণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, ‘সাহাবুদ্দিনের কাছ থেকে মোট এক কোটি টাকা ঘুস নেওয়া হয়েছে। ৮ কোটি ১৫ লাখ টাকার বিপরীতে এই টাকা কমিশন দিতে হয়েছে তাকে। আরও ৭ শতক জমির টাকা উত্তোলনের সময় তিনি নতুন করে কোনো ঘুস দিতে পারবেন না বলে জানিয়ে দেন। এসব কারণে সাহাবুদ্দিন গাজী মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন।’

ড. বদিউল আলম বর্তমানে চট্টগ্রামে উপ-ভূমি সংস্কার কমিশনার (উপসচিব) হিসাবে কর্মরত। মোহাম্মদ রাশেদ হোসেন চৌধুরী এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক নাজমুল হাসান অভিযোগে প্রভাব ও দায়িত্ব অস্বীকার করেছেন।

স্থানীয় ভুক্তভোগীর মন্তব্য

সাহাবুদ্দিন গাজীর ছোট ছেলে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী জিএম শরীফ যুগান্তরকে বলেন, ‘নরসিংদী এলএ শাখায় জমি অধিগ্রহণ চূড়ান্ত করতে কী পরিমাণ হয়রানি করা হচ্ছে, তা স্বচক্ষে না দেখলে বোঝা মুশকিল। বৃদ্ধ বাবা মৃত্যুর আগে এমন হয়রানির বিষয়টি আমাদের কাছে কখনো বলেননি। বাবার মৃত্যুর পর এলএ শাখায় এসে অনেককে চোখের পানি ফেলতে দেখছি। এরপর আছে দালালদের উৎপাত, ভুয়া আপত্তি।’

ঘুসের রাজসাক্ষী সার্ভেয়ার

চলমান এই প্রকল্পে কে কীভাবে জমি অধিগ্রহণের টাকা পেয়েছেন, এর চাঞ্চল্যকর স্বীকারোক্তি দিয়েছেন নরসিংদী এলএ শাখার সার্ভেয়ার মো. আমির হোসেন। তিনি স্বীকার করেছেন যে জমির শ্রেণিভেদে কমিশনের ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত আলোচনায় মীমাংসা করতে পারতেন। তার বেশি হলে সরাসরি জেলা প্রশাসকের নিয়ন্ত্রণে চলে যেত।

ঘুস লেনদেনের সব তথ্য, চেক, ব্যাংক লেনদেন এবং দালাল চক্রের ভাগবাঁটোয়ারার বিস্তারিত তিনি প্রকাশ করেছেন।

প্রকল্প ব্যপারে তথ্য

ঢাকা-সিলেট করিডর সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে ১৬,৯৭৮ কোটি টাকা সংস্থান রয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ঢাকা-সিলেট অংশে ৭টি জেলায় ৮ একর ৩০ শতক জমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে ৬৬টি এলএ কেসের মধ্যে মাত্র ৮টির দখল হস্তান্তর হয়েছে। চার বছরে প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র ১৫ শতাংশ।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

শিবির নেতা সাইফুল্লাহ বারী হত্যা মামলার প্রধান আসামি যুবদল নেতা মুকুল গ্রেপ্তার

🚨 শিবির নেতা সাইফুল্লাহ বারী হত্যা: প্রধান আসামি যুবদল নেতা মুকুল গ্রেপ্তার 📍 সাঘাটা (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি | Time tv24 গাইবান্ধার স...